যুক্তরাষ্ট্রে কৃত্রিম ক্রিসমাস ট্রির বাজারে শুল্কচাপ বাড়ছে

চাহিদার তুলনায় খুব কমই কৃত্রিম ক্রিসমাস ট্রি তৈরি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এ কারণে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় বড়দিন উদযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গটি।

চাহিদার তুলনায় খুব কমই কৃত্রিম ক্রিসমাস ট্রি তৈরি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এ কারণে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় বড়দিন উদযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গটি। এ চিত্র খুব পরিচিত হলেও চলতি বছর খানিকটা ভিন্ন চেহারা নিয়েছে। কারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প আরোপিত শুল্কনীতির আঁচ কৃত্রিম ক্রিসমাস ট্রি বাজারেও পড়েছে। খবর এপি।

আমেরিকান ক্রিসমাস ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, শুল্কের কারণে চলতি বছর কৃত্রিম গাছের দাম ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। ফলে অনেক বিক্রেতা ক্রয়াদেশ কমিয়েছে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এশিয়ায় বড় পরিসরে উৎপাদন হচ্ছে কৃত্রিম গাছ। পুরো প্রক্রিয়া আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা কম।

নিউজার্সিভিত্তিক ন্যাশনাল ট্রি কোম্পানি ১০ লাখের বেশি কৃত্রিম গাছ বিক্রি করে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও ক্রিস বাটলার বলেন, ‘কৃত্রিম গাছ তৈরি একটি শ্রমঘন প্রক্রিয়া। এতে এমন আলো ও যন্ত্রাংশ ব্যবহার হয়, যা যুক্তরাষ্ট্রে নেই।’

চলতি বছর উদযাপনের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৮০ শতাংশ মার্কিন পরিবার কৃত্রিম ক্রিসমাস ট্রি ব্যবহার করছে। এ হার অন্তত ১৫ বছর ধরে অপরিবর্তিত রয়েছে।

কৃত্রিম গাছের প্রায় ৮০ শতাংশেই আগে থেকে আলো লাগানো থাকে। এ চাহিদার প্রেক্ষাপটেই ১৯৯০-এর দশকে প্রথমে কৃত্রিম ক্রিসমাস ট্রির উৎপাদন যুক্তরাষ্ট্র থেকে থাইল্যান্ডে এবং পরে চীনে স্থানান্তর হয়। বালসাম ব্র্যান্ডসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও ম্যাক হারম্যান জানান, ডালের চারপাশে আলো পেঁচানোর কাজটি সময়সাপেক্ষ হওয়ায় এটিও শ্রমনির্ভর উৎপাদন প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত।

ক্রিস বাটলারের তথ্য অনুযায়ী, পাতা ছাঁচে ঢালাই, কাটা, ডাল জোড়া লাগানো এবং আলো যুক্ত করার পুরো প্রক্রিয়াসহ একটি কৃত্রিম গাছ তৈরি করতে ১-২ ঘণ্টা সময় লাগে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ কৃত্রিম ক্রিসমাস গাছ চীনে তৈরি হয়। যেখানে শ্রমিকদের ঘণ্টাপ্রতি মজুরি দেড় থেকে ২ ডলার।

হারম্যান বলেন, ‘বালসাম ব্র্যান্ডসের চীনা অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিতে ১৫-২০ হাজার কর্মী কাজ করেন এবং ইন্দোনেশিয়ার আরেকটি কারখানায় সর্বোচ্চ ১০ হাজার কর্মী নিয়োজিত।’

হারম্যান জানান, প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় বালসাম ব্র্যান্ডস যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যে কৃত্রিম গাছ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়ে একটি সমীক্ষা চালায়। সে সময় আমদানি করা ক্রিসমাস সাজসজ্জার ওপর শুল্ক আরোপের প্রস্তাব আলোচনায় ছিল। তখন উৎপাদনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের পর কোম্পানিটি সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, বাজারে ৮০০ ডলারে বিক্রি হওয়া একটি গাছ যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি করলে দাম প্রায় ৩ হাজার ডলারে পৌঁছতে পারে।

ক্যালিফোর্নিয়ার ফেয়ারফিল্ডে অবস্থিত ১৯০২ সালে প্রতিষ্ঠিত লি ডিসপ্লের কারখানা। কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মার্ক লাতিনো জানান, বর্তমানে এটি যুক্তরাষ্ট্রের হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একটি, যারা এখনো দেশেই কৃত্রিম ক্রিসমাস গাছ তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটি বছরে প্রায় ১০ হাজার কৃত্রিম গাছ উৎপাদন করে।

লি ডিসপ্লেতে সারা বছর সাধারণত তিন-চারজন কর্মী কাজ করেন। ছুটির মৌসুমে ইনস্টলেশন ও ডিসপ্লে-সংক্রান্ত কাজে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ করা হয়। আমদানি শুল্কের প্রভাব লি ডিসপ্লের ওপরও পড়েছে। কোম্পানির বিপণন বিভাগের প্রধান জেমস লাতিনো জানান, চলতি বছর চীন থেকে আলো বা সাজসজ্জার সামগ্রী আমদানি করেননি তিনি এবং আগের মজুদ ব্যবহার করেছেন। তবে আগামী বছর নতুন করে আমদানি করতে হলে বাড়তি খরচ বহন করতে হবে।

কিছু প্রতিষ্ঠান চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে বিকল্প দেশ খুঁজছে। ন্যাশনাল ট্রি কোম্পানি ২০২৪ সালে কম্বোডিয়ায় আংশিক উৎপাদন স্থানান্তর করেছে। প্রয়োজনে চীনের বাইরে থেকেই পুরো সরবরাহ নিশ্চিত করবে কোম্পানিটি।

তবে সরবরাহের উৎস পরিবর্তনের পরও শুল্কের প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো যায়নি। এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন কম্বোডিয়া থেকে আমদানির ওপর ৪৯ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেয়, যা পরে কমিয়ে ১৯ শতাংশ করা হয়। আমেরিকান ক্রিসমাস ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চীন থেকে আমদানি করা কৃত্রিম গাছের ওপর আরোপিত গড় শুল্কহার প্রায় ২০ শতাংশ।

ক্রিস বাটলার জানান, তার কোম্পানি কম গাছ আমদানি করেছে এবং দাম প্রায় ১০ শতাংশ বাড়িয়েছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে চাহিদা দুর্বল থাকায় গ্রাহকদের ছাড় দিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হয়েছে।

বালসাম ব্র্যান্ডস শুল্কজনিত ব্যয় সামাল দিতে কর্মী সংখ্যা ১০ শতাংশ কমিয়েছে, ভ্রমণ ব্যয় বাতিল করেছে, বেতন বৃদ্ধি স্থগিত রেখেছে এবং কিছু অভ্যন্তরীণ সুবিধা কমিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি গাছের দামও প্রায় ১০ শতাংশ বাড়িয়েছে।

হারম্যান জানান, এ বছর যুক্তরাষ্ট্রে বালসাম ব্র্যান্ডসের বিক্রি ৫-১০ শতাংশ কমেছে, তবে জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও ফ্রান্সে বিক্রি ১০ শতাংশ বা তার বেশি বেড়েছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কনীতির কারণে চাহিদা কমেছে।

আরও